A
পৃথিবীর প্রথম ভূত
প্রথম কবে হয়েছিল ভূতের উল্লেখ? কবে থেকে ভূতে ভয় পাচ্ছে মানুষ? পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের ভূতে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের গল্প, লিখেছেন অচ্যুত দাস
সে দিন তর্ক হাতাহাতির পর্যায়ে গড়াচ্ছিল। তর্কটি পুরনো, কিন্তু তার ঝাঁঝ যুগে যুগে থেকে গেছে একই। তর্কের বিষয়: ভূত আছে না নেই? স্থান: আমাদের শহরের ধার ঘেঁষে বয়ে যাওয়া নদীর গায়ের বাঁধের উপর। টিউশনস্যর সে দিন এক ঘণ্টা আগেই ছুটি দিয়েছেন, তাই যে যার বাড়ি ফেরার আগে একটু আড্ডা মারব বলে প্রতীক, অর্কপ্রভ, আমি আর স্বাগতা বাঁধে এসেছিলাম, যেমনটা আমরা প্রায়ই আসতাম।
বাঁধের গায়ে ল্যাম্পপোস্ট অন্য জায়গার চেয়ে কম। বাঁধের উপর তাই আলো কম, আঁধার বেশি। উপরন্তু, বাঁধের উপর বছরের সব সময়ই পড়শি নদীর ঠান্ডা জলের প্ররোচনায় শিরশিরানি হাওয়া। ফলে এ কথা সে কথা হতে হতে সে দিন ভূতের আলোচনায় ঢুকে পড়তে আমাদের দেরি হয়নি। কে জানত, এই নিয়েই একেবারে তুমুল তর্ক বেঁধে যাবে প্রতীক আর স্বাগতার! এ বলে, “ভূত নেই, থাকতে পারে না, ছিল না কোনও দিন।” উত্তরে ও বলে, “তুই জাপান দেখিসনি মানে কি জাপান দেশটাই নেই নাকি?” বাড়ি ফেরার কারও তাড়া ছিল না, তাই আমি আর অর্ক কখনও প্রতীক, কখনও স্বাগতার পক্ষ নিয়ে তর্কের আগুন কিছুতেই নিভতে দিচ্ছিলাম না। এমন একটা মারমার কাটকাট সময়ে প্রতীক যেই না বলেছে, ভূতফুত হচ্ছে আধুনিক, অলস মানুষের কল্পনার ফসল, অমনি পাশ থেকে কে যেন বলে উঠেছিল, “আর আমি যদি বলি, সাড়ে তিন হাজার বছর পুরনো লেখায় মানুষ ভূতের কথা লিখেছে, তার ছবিও এঁকেছে!”
মিথ্যে বলব না, আমরা একটু চমকেই গেছিলাম। আবছা আলো-ছায়ায় অচেনা কণ্ঠস্বরটা কার? এ-দিক ও-দিক তাকিয়ে চোখে পড়েছিল, আমাদের বেঞ্চের ঠিক পাশের বেঞ্চে রোগা-পাতলা এক জন লোক কে জানে কখন থেকে ঘাপটি মেরে বসে! প্রতীকের কথার জবাব এসেছে তার কাছ থেকেই। প্রতীক খুব বিরক্ত হয়ে জানতে চেয়েছিল, “কে আপনি? কী বলতে চান?”
ভদ্রলোক আশ্চর্য, উঠে পড়ে এগিয়ে এসে আমাদের বেঞ্চের এক পাশে একটু জড়সড় হয়ে বসে বলতে শুরু করেছিলেন, “আমি তো সন্ধের পর হাওয়া খেতে এ দিকটায় আসিই। কাছেই আমার বাড়ি কিনা। তোমাদের তর্কাতর্কি অনেক ক্ষণই শুনছি। কিন্তু ওই যে তুমি বললে না, ভূত হল গিয়ে আধুনিক আর আসল মানুষের...”
আমি শুধরে দিতে বাধ্য হলাম, “আসল নয়, ভূতকে অলস মানুষের কল্পনা বলেছিল প্রতীক।”
ভদ্রলোক অদ্ভুত, হাওয়া খেতে এসেছেন, অথচ গলায় একটা মাফলার জড়িয়ে। সেটা আরও ভাল করে গলায় জড়িয়ে নিয়ে খুব এক গাল হেসে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, আধুনিক আর অলস মানুষের কল্পনা। ঠিক! কিন্তু কথাটা তো ঠিক নয়। তাই আর থাকতে না পেরে...”
স্বাগতা নিজের দলে লোক পেয়ে উৎসাহ দিয়েছিল অচেনা লোকটিকে, “বেশ করেছেন। আপনি বলুন তো, সাড়ে তিন হাজার বছর আগের কথা কী যেন বলছিলেন!”
![]() |
| শিল্পীর কল্পনায় ব্যাবিলনের সভ্যতা |
.
আমাদের ছোট শহরে প্রায় সকলেই সকলের মুখচেনা। মনে হল, এ লোকটিকেও আমরা দিনের আলোয় দেখলে কেউ না-কেউ চিনতে পারতাম। এখন পরিচয় জেনে কী বা হবে ভাবলাম, আর সে অবকাশও পাওয়া গেল না, কারণ ভদ্রলোক সটান বলতে শুরু করলেন, “ব্যাবিলনের নাম শুনেছ? মেসোপটেমিয়া সভ্যতা?”
অর্ক বলল, “সে আবার শুনব না? ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের কথা সেই কোন ছোটবেলা থেকে জানি!”
![]() |
| ভূতের প্রাচীনতম ছবি |
.
ভদ্রলোক হতোদ্যম না হয়ে আবছা মুখের উজ্জ্বল হাসি ধরে রেখে বললেন, “সেখানেই তো পাওয়া গেছে ভূতের প্রাচীনতম ছবি।”
প্রতীক ফস করে জ্বলে উঠল, “ভূতকে নাকি দেখাই যায় না। ব্যাবিলনের বাসিন্দারা কি ভূত দেখার উপায় বের করেছিল বলতে চান? মজা করছেন আমাদের সঙ্গে?”
ভদ্রলোক আমাদের চমকে দিয়ে বলতে থাকলেন, “মোটেই মজা করছি না। বেশি দিন না, বছর তিন চার আগে ব্রিটিশ মিউজ়িয়মের এক কোণে পড়ে থাকা একটা ক্লে ট্যাবলেট খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে জাদুঘরের এক কর্তা ভূতের ছবিটা দেখতে পান।”
ক্লে ট্যাবলেট কী জিনিস, তা-ও আমাদের অজানা নয়। ব্যাবিলনে আজ থেকে তিন, চার, পাঁচ হাজার বছর আগেও লেখালিখির চল ছিল। কিন্তু তখন তো এখনকার মতো দিস্তে দিস্তে কাগজ ছিল না। তাই মাটির তৈরি চ্যাপ্টা ফলকে লিখত সকলে। তাকেই আমরা নাম দিয়েছি, ক্লে ট্যাবলেট। মিশরের লোকেও ক্লে ট্যাবলেটে লিখত, জানি। প্রতীক তবু মানতে নারাজ। ভদ্রলোককে কথা শেষ করতে না দিয়েই সে বলল, “কী করে বোঝা গেল যে ওটা ভূতেরই ছবি? কেমন দেখতে সেই ভূতকে?”
![]() |
| ভূত মানুষকে উত্ত্যক্ত করছে হাজার হাজার বছর ধরে |
.
ভদ্রলোক উৎসাহ পেয়ে বললেন, “ভূতের ছবিটাও কিছু কম ভূতুড়ে ছিল না। খালি চোখে সে জিনিস ধরা পড়ে না। কিন্তু ক্লে ট্যাবলেটটার উপর আলো ফেলে, উপর থেকে তাকে দেখলেই ছবিটা চোখের সামনে ফুটে উঠবে পরিষ্কার। ব্রিটিশ মিউজ়িয়মের সেই কর্তাব্যক্তি যখন ছবিটা খেয়াল করেন, তখন তিনিও বুঝতে পারেননি, ছবিটা কী বোঝাচ্ছে। কিন্তু ছবির উল্টো দিকে, ট্যাবলেটটার গায়েই প্রাচীন কিউনিফর্ম লিপিতে লেখা ছিল ছবির বিবরণ। তোমরা যে... তোমাদের ‘তুমি’ই বলছি... তোমরা যে হাতে হাতে ফোন নিয়ে ঘোরো, সেখানে ইন্টারনেটে সার্চ করলেই ছবিটা দেখতে পাবে। পেলে দেখবে, ছবির গায়ে রেখা বুলিয়ে ছবির চরিত্র দুটোকে স্পষ্ট করে দেখানোও হয়েছে কোথাও কোথাও। সেখানেই বোঝা যায়, ছবিতে আছেন দু’জন মানুষ। সামনে এক মহিলা হেঁটে যাচ্ছেন, পিছনে এক লম্বা দাড়ি-গোঁফের, শীর্ণকায় পুরুষ। বিষণ্ণ সেই পুরুষের দুটো হাতই দড়ি দিয়ে বাঁধা। সেই দড়ির এক প্রান্ত ধরে লোকটিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সেই মহিলা।”
ভদ্রলোক কথা শেষ করতে না-করতেই অর্ক জানতে চাইল সেই প্রশ্নটা, যেটা আমরা বোধ হয় সকলেই সেই মুহূর্তে মনে মনে ভাবছিলাম, “কী লেখা ছিল ট্যাবলেটের গায়ে কিউনিফর্ম লিপিতে? সেটা পড়া গেছে?”
![]() |
| ভূত অকারণে আসে না, এই ছিল প্রাচীন বিশ্বাস |
.
অর্কর কৌতূহল দেখে ভদ্রলোক খুবই আনন্দ পেলেন যেন। নড়েচড়ে বসে বললেন, “যায়নি আবার! কিউনিফর্ম লিপি সেই সময় মধ্য প্রাচ্য ও তার আশপাশে অনেক দেশেই ব্যবহার হত। এই ট্যাবলেটের গায়ের লিপি পড়েই তো বোঝা গেছে, তার উল্টো পিঠের ছবিটা কী বোঝাচ্ছে। ট্যাবলেটের গায়ে লেখা আছে, মৃত আত্মীয়ের আত্মা কখনও তার বাড়িতে ফিরে এলে তাকে কী করে বিদেয় করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির অতৃপ্ত আত্মা মৃত্যুর পরেও এক জন সঙ্গী খুঁজছিল। তাই ট্যাবলেটের গায়ে লিখে দেওয়া হয়েছে, এর থেকে পরিত্রাণ পেতে গেলে কী ভাবে দুটো ছেলে আর মেয়ে পুতুল জোগাড় করতে হবে। তাদের কী ভাবে সাজাতে হবে। ছেলে পুতুলটা এখানে মৃত আত্মীয়র আদল পাবে। ট্যাবলেটের গায়ের ছবিতে যেমন ছেলে পুতুলের মুখে ছিল বড় দাড়ি গোঁফ, পুতুলটা ছিল লম্বা। ট্যাবলেটে আরও লেখা ছিল, পুতুল দুটোর কোনটাকে কেমন পোশাক পরাতে হবে। তার পর ছেলেটার হাত দুটো কী ভাবে সামনে দিকে বেঁধে দিতে হবে। দড়ির বাঁধনের অন্য প্রান্তটা দিতে হবে মেয়েটার হাতে। মেয়েটা থাকবে সামনে। ছেলেটা পেছনে। সূর্যোদয়ের সময় সে দিকে মুখ করে ওই পুতুল দুটোকে রেখে সূর্যদেবতাকে স্মরণ করে মন্ত্র বলতে হবে। তা হলেই অশান্ত আত্মা কিংবা ভূত, তার নিজের জায়গা, প্রেতলোকে ফিরে যাবে।”
.
মেসোপটেমিয়ার ভূত
![]() |
| অনেকে মানতেন, অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে আত্মা ইহজগতে ফিরে আসতে পারে |
.
গা ছমছম করছিল, তাও আমাদের সকলের তীব্র একটা কৌতূহলও হচ্ছিল। আমরা তাই মাঝে মাঝে প্রশ্ন করে ওঁর কথা শুনতে থাকলাম। মেসোপটেমিয়ার ভূত নিয়ে ভদ্রলোক আরও বললেন যে, সেখানকার লোকে বিশ্বাস করত, মৃত্যুর পর আত্মা যায় ইরকাল্লা নামের নরকে। মৃতদের স্যাঁতসেঁতে জগৎ, সেই ইরকাল্লার রানির নাম এরিশ্কিগল। তাঁর নজর এড়িয়ে ইরকাল্লা ছেড়ে বেরোনোর উপায় নেই কোনও আত্মার। এই সভ্যতার মানুষ ভাবত, কারও রোগ অসুখ হয়েছে মানেই সে নিশ্চয়ই কোনও ভীষণ বাজে কাজ করেছে। তাই তাকে ভগবান কিংবা ভূতে শাস্তি দিচ্ছে। মেসোপটেমিয়ায় দু’রকম ডাক্তার ছিলেন, আসু এবং আসিপু। আসু ডাক্তাররা প্রেসক্রিপশন লিখে ওষুধ দিতেন, দরকারে শল্যচিকিৎসাও করতেন। আর আসিপুরা মূলত টোটকা, তুকতাকে বিশ্বাসী ছিলেন। আসিপু ডাক্তাররা অসুস্থ মানুষের ভূত তাড়াতে মন্ত্রও পড়তেন, কিন্তু তার আগে তাঁরা ভূতের উপদ্রবে অতিষ্ঠ মানুষটিকে বলতেন, নিজের জীবনের সমস্ত কুকর্মের কথা স্বীকার করতে। এক মাত্র তবেই অশান্ত আত্মা নিজের জগতে ফিরে যাবে। মেসোপটেমিয়ার লোকেরা ভূতকে বলত গিডিম। মৃতের শ্রাদ্ধশান্তি ঠিক মতো না হলে, কিংবা মৃত্যু অস্বাভাবিক ভাবে হলেও গিডিম প্রেতলোক ছেড়ে ইহলোকে ফিরে আসত। আবার কখনও সম্পূর্ণ অকারণেও ফিরে এসে সাধারণ মানুষকে উত্ত্যক্ত করত। এই পাজি ভূতদের শাস্তি দিতেন সূর্যদেবতা শামাশ। পাজি ভূতের খাবার চুরি করে তিনি সেই দুঃখী ভূতদের দিতেন, পৃথিবীতে যাদের কোনও আত্মীয়ই বেঁচে নেই। আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করতে গিডিম কখনও ইহলোকে ফিরেছে, এমন ঘটনার বর্ণনাও লেখায় পাওয়া গেছে মেসোপটেমিয়া থেকে।
.
মিশরের ভূত
![]() |
| ছবি এবং লেখায় ভরা ‘বুক অফ দ্য ডেড’-এর পাতা |
.
একটা দিন অবসর পেয়ে ভূতের ভূতকালের গল্প শুনতে ভালই লাগছিল। মিশরের সভ্যতা অন্তত পাঁচ হাজার বছর পুরনো বলে জানি। মৃত্যুর পরে আত্মার কী হয়, পরলোক কেমন, এই নিয়ে তাদের চূড়ান্ত কৌতূহল এবং কিছু দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এ-ও আমরা সকলে জানি। পারলৌকিক ক্রিয়াকর্মের রীতিনীতি লেখা ওদের বইয়ের নাম দেওয়া হয়েছে, ‘দ্য বুক অফ দ্য ডেড’। সে দিন আরও জানলাম, ‘মৃত্যুর পর আমি আর থাকব না,’ এটা ভাবতে মিশরীয়রা খুবই ভয় পেত। ওদের বিশ্বাস ছিল, মৃত্যুর পর আত্মা সত্যের সভাঘরে যায়। সেখানে দেবতা ওসাইরিস এবং বিয়াল্লিশ জন বিচারকের সামনে তার বিচার হয়। একটা দাঁড়িপাল্লার এক দিকে মৃত ব্যক্তির হৃৎপিণ্ড চাপানো হয়। অন্য দিকে থাকে সত্যের সাদা পালক। সেই পালকের তুলনায় কারও হৃদয় হালকা হলে তার আত্মা সিধে স্বর্গের বাগানে চলে যায়, আবার পরজন্মের সুযোগ পায়।
![]() |
| সত্যের সভাঘরে আনুবিসের সামনে দাঁড়িপাল্লায় হৃদয়ের ওজন নেওয়া হচ্ছে, মাটিতে দাঁড়িয়ে আমিট |
.
কিন্তু উল্টোটা হলে হৃৎপিণ্ডটা ছুড়ে ফেলা হয় মাটিতে আর সঙ্গে সঙ্গে আমিট নামের দৈত্য তেড়ে আসে। আমিটের মাথাটুকু কুমিরের। কেশর আর গা-টা সিংহের। কোমর থেকে বাকিটা জলহস্তীর। সত্যের সভাঘরে ছুড়ে ফেলা হৃদয় কামড়ে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলে আমিট। দুষ্ট আত্মার গল্প সেখানেই শেষ। মৃত্যুর পর দেবতাদের সামনে এই পরীক্ষায় পাশ করতে না পেরে পরলোক গমন ভেস্তে না যায়, সেই ভয়ে মিশরীয়দের সংযত জীবন যাপন করতে বলা হত।
প্রথম দিকে মিশরে আত্মাকে বলা হত ‘খু’। পরের দিকে ওরা মানত, সব আত্মারই ৯টি উপাদান আছে। তার দু’টি, ‘বা’ আর ‘কা’ মিলে তৈরি হয় ‘আখ’। এই আখই কারণে বা অকারণে ইহজগতে ফিরে এসে গোলমাল বাধায়। মিশরের এক মহিলার প্রাচীন সমাধিতে তার স্বামীর চিঠি পাওয়া গেছে। তাতে বার বার লেখা, ‘আমি তো তোমার সব কথা মেনে চলি। তোমার কথাই ভাবি। তোমার শেষকৃত্যে কোনও ত্রুটি রাখিনি। তাও কেন তুমি আমাকে শান্তিতে একা থাকতে দিচ্ছ না?’ ভূত ফিরে এসে উৎপাত করে, এ কথা সুতরাং, মিশরীয়দের অনেকেই সত্যি বলে মনে করত। ভূতের উপদ্রব থেকে রক্ষা পেতে পুরোহিতদের ডেকেও আনত।
.
গ্রিস ও রোমের ভূত
![]() |
| তিন মাথাওয়ালা কুকুর, সেরবেরাস |
.
মধ্য প্রাচ্যের ভূতেদের গল্প শুনে এ বার ইচ্ছে করছিল ইউরোপের ভূতুড়ে অতীত জানতে। নিরাশ হতে হল না, কারণ দেখা গেল ভদ্রলোক এ সবই গুলে খেয়েছেন। গড়গড় করে তিনি বলে গেলেন, প্রাচীন গ্রিসের লোকের বিশ্বাস ছিল, পরলোকে তিন-তিনটে আলাদা জগৎ। সেই জগৎ পর্যন্ত পৌঁছোনোর গল্পটিও চমৎকার। কেউ মারা গেলে গ্রিকরা তাঁর মৃতদেহের মুখের উপর একটি কয়েন বা মুদ্রা রাখতেন। প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, মৃত আত্মাকে পরলোকে নিয়ে যাবে একটি নৌকা। সেই নৌকার মাঝির পারিশ্রমিক ওই কয়েন। মনে করা হত, যত দামি কয়েন, নৌকায় বিদেহী আত্মা তত ভাল জায়গা পাবে। নৌকা চেপে পরলোকে পৌঁছে গেলে আত্মার দেখা হবে তিন মাথাওয়ালা কুকুর, সেরবেরাসের সঙ্গে। হ্যারি পটারের গল্পে হ্যাগ্রিডের পোষ্য, তিন মাথাওয়ালা কুকুর ফ্লাফির অনুপ্রেরণাও এই সেরবেরাসই। গ্রিকদের বিশ্বাস ছিল, সেরবেরাসের সাক্ষাৎ পাওয়ার পরেই তিন বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে আত্মাকে তাঁর জীবদ্দশার কর্মকাণ্ডের হিসেব দিতে হবে। সেটি হয়ে গেলে বিচারকত্রয়ী আত্মাকে স্বর্গের নদী থেকে এক পেয়ালা জল পান করতে দেবেন। সেই জল খেলেই আত্মা তার ইহকালের সমস্ত ঘটনা ভুলে নতুন জীবনের জন্য তৈরি হবে।
তার পর জানলাম, সেই তিনটে জগতের কথা। কোনও যোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গেলে তাকে পাঠানো হত ‘এলিসিয়ান ফিল্ড’-এ, যা আমাদের স্বর্গের মতো। কেউ ভাল মানুষের জীবন কাটালে তাকে পাঠানো হত ‘অ্যাসফোডেল’-এর সমতলে, যেটিও মোটামুটি মনোরম জায়গা। মন্দ লোকের আত্মাকে যেতে হত ‘টারটারাস’ নামের অন্ধকার জগতে। কিন্তু কোনও আত্মাকেই সেখানে চির কাল থেকে যেতে হত না। টারটারাসের আত্মার পাপের প্রায়শ্চিত্ত সম্পন্ন হলে সে অ্যাসফোডেল বা এলিসিয়ান ফিল্ডে ফিরে আসত। অর্থাৎ, অনন্ত কাল নরকভোগের ধারণা বা বিশ্বাস গ্রিকদের মধ্যে ছিল না।
![]() |
| অসময়ে অস্বাভাবিক মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে পারে ভূত, মানত রোমানরা |
.
আরও জানলাম, রোমের মানুষদের মধ্যেও ভূত নিয়ে চর্চা চলত। অনেক বিখ্যাত রোমান নাটক কিংবা গল্পে বার বার ভূতদের প্রসঙ্গ এসেছে। কোনও নাটকে হয়তো ভূত ছিলই না, নাটকের চরিত্ররা নেহাতই মজার ছলে একে অন্যকে ভূতের কথা বলে ভয় দেখাচ্ছিল। কোনও গল্পে আবার দেখানো হয়েছে, ভূত ইহজগতে ফিরে এসে জীবিতদের সঙ্গে তোফা সময় কাটাচ্ছে। সেখানেই শেষ নয়, আরও শুনলাম– জিশুখ্রিস্টের জন্মের একশো বছর মতো পরে, রোমান লেখক প্লিনি দ্য ইয়ঙ্গার একটা গল্প লিখেছেন। তাতে অ্যাথেনোডোরাস নামের এক দার্শনিক এথেন্স শহরে এসে ভাড়াবাড়ি খুঁজতে গিয়ে এক ভূতুড়ে বাড়ির সন্ধান পান। ভূতের উপদ্রবের জন্য সেই বাড়ির ভাড়া কম, তাই অ্যাথেনোডোরাস সেখানেই থাকা মনস্থ করেন। রাতের বেলা শিকলের ঝনঝনানি শুনে ঘুম ভাঙলে তিনি দেখেন, শীর্ণকায়, বয়স্ক, দাড়িওয়ালা এক ছায়ামূর্তি তাঁকে ঘরের বাইরে যেতে ইশারা করছে। তার পিছু হেঁটে অ্যাথেনোডোরাস বাড়ির উঠোনে আসতেই ছায়ামূর্তি অদৃশ্য হয়ে যায়। ঠিক যেখানে সে অদৃশ্য হয়েছিল, অ্যাথেনোডোরাস পর দিন সকাল সকাল লোকজন ডেকে সেখানকার মাটি খোঁড়াতে শুরু করেন। কিছুটা খুঁড়তেই শিকলে বাঁধা একটা কঙ্কাল খুঁজে পাওয়া যায়। সেই দেহাবশেষকে যথাবিধি রীতি মেনে আবার সমাধিস্থ করার পর সেই বাড়িতে ভূতের উপদ্রব বন্ধ হয়।
এই গল্পে ঠিক মতো সমাধিস্থ করা হয়নি বলে ভূত ফিরে এসেছিল। অন্য এমন অনেক কাহিনিও রোমানদের মধ্যে প্রচলিত ছিল, যেখানে অতৃপ্ত আত্মা অন্যায় ভাবে হওয়া তাঁর অসময়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ফিরে আসত। এ সব থেকেই বোঝা যায় যে, ভূত, পরলোক এবং ভূতের আবার ফিরে আসা– এই নিয়ে রোমানরা ভালই চর্চা করত, গল্প-নাটক লিখত, ভয়ও পেত।
.
চিন দেশের ভূত
![]() |
| ছায়া আছে, কায়া নেই |
.
অনেক ক্ষণ গল্প শুনেও বিরক্ত লাগছিল না, বরং আরও জানতে ইচ্ছে করছিল। ভদ্রলোকও মনে হচ্ছিল, আমাদের মতো মনোযোগী শ্রোতা পেয়ে খুব খুশি। বিলেত ছেড়ে তিনি এ বার সটান চলে এলেন আমাদের পড়শি দেশ, চিনে। বললেন, খ্রিস্টজন্মের পাঁচশো বছর আগে, মানে আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগেও চিনা দার্শনিক মো তি ভূতে বিশ্বাসের কথা লিখে গিয়েছেন। সেই সময় চিনে রটে গেছিল, এক মন্ত্রীর ভূত ইহলোকে ফিরে এসে তখনকার এক রাজাকে হত্যা করেছে। মো তি এই রটনা বিশ্বাস করেছিলেন। কারণ, যাঁরা এই ঘটনার কথা তাঁকে জানিয়েছিলেন, তাঁদের উপর মো তি-র বিশ্বাস ছিল অগাধ। বিশ্বস্ত লোকের বলা ভূতের গল্পও বিশ্বাস করব, এই ছিল মো তি-র মতামত।
![]() |
| ভূতের উপদ্রবে মানুষের বিশ্বাস অনেক প্রাচীন |
.
এমনিতে চিনের আদি বাসিন্দাদের পরলোক সম্পর্কে ধারণা মিলে যায় গ্রিকদের প্রাচীন বিশ্বাসের সঙ্গে। ওদের মতো চিনারাও মানত, মৃত্যুর পর আত্মা তার পুরনো জীবনের কথা সব ভুলে গিয়ে হয় স্বর্গসুখ ভোগ করে কিংবা নরকে গিয়ে অশেষ দুর্ভোগের মুখোমুখি হয়। ওরা এ-ও মানত যে, পরলোক থেকে আত্মা এমনি এমনি ফিরে আসে না। এলে, সুনির্দিষ্ট কারণে আসে এবং কিছু একটা গোলমাল পাকাতেই আসে। তেমন গোলমাল বাধে না, যদি কারও অস্বাভাবিক মৃত্যু না হয়, যদি মৃত ব্যক্তির পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। চিনের প্রাচীন ভূতের গল্পগুলোয় তাই অনেক সময়ই উপদেশ আকারে এই কথাগুলো লেখা থাকত।
.
পশ্চিমের ভূত
![]() |
| মায়া সভ্যতার ভূতুড়ে নিদর্শন |
.
আমেরিকার মায়া আর অ্যাজ়টেক সভ্যতার কথাও আলোচনায় এল। মেসোপটেমিয়ার লোকেদের মতোই মায়া সভ্যতার লোকেরাও বিশ্বাস করত, পরলোক খুবই বিচ্ছিরি আর অন্ধকার এক জায়গা। ভদ্রলোক বলছিলেন, “আমাদের নরক ছিল ওদের ‘জ়িব্যালবা’। সেখান থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় খুঁজত আত্মারা আর সেটা আটকাতে নানা রকম ফন্দি করত জ়িব্যালবার একাধিক ‘লর্ড অফ দ্য ডেড’। সমস্ত বাধা পেরিয়ে আত্মাকে পৌঁছোতে হত জীবনবৃক্ষের (ট্রি অফ লাইফ) কাছে, যা বেয়ে উপরে উঠে গেলেই সিধে পৌঁছে যাওয়া যেত স্বর্গে। এই ছিল মায়াদের বিশ্বাস।”
![]() |
| ‘চুড়েল’ ছিল আমেরিকাতেও |
.
শুনে অবাক হয়ে গেলাম, ভারতের উত্তর ও পশ্চিম দিকের হিন্দিভাষীরা যাকে বলেন ‘চুড়েল’, কিছুটা সেই একই জিনিসে বিশ্বাস ছিল সেই কোন সুদূর আমেরিকার অ্যাজ়টেক সভ্যতার মানুষদের। ওদের চুড়েলের নাম ছিল সিহুয়াটেটেও। সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেছেন এমন মহিলার ভূতই হল সিহুয়াটেটেও। অ্যাজ়টেকরা বিশ্বাস করত, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পথচারীদের অপেক্ষায় থাকত এই ভূত। পুরুষদের সে কিছু বলত না। কিন্তু কোনও মহিলা তার সন্তান নিয়ে রাস্তায় বেরোলে মহিলাকে মেরে তার বাচ্চা চুরি করে পালাত সিহুয়াটেটেও। ভদ্রলোক বললেন, “ওদের প্রচলিত বিশ্বাসে ভূত ছিল, ফলে ভূতের জ্বালাতন থেকে বাঁচার উপায়ও চাই। ভূতকে ঠেকানোর জন্য এখন যেমন চলে, তেমন তাবিজ, কবচ, ফুল, মালার টোটকা সে আমলেও চলত।”
.
ভারতের ভূত
![]() |
| ভূত থাকলে, সে হতেই পারে প্রতিহিংসাপরায়ণ |
.
“সবই বুঝলাম। কিন্তু আসল প্রশ্নটার উত্তর তো এখনও পাওয়া গেল না। ভূত আছে না নেই?” স্বাগতা বেঞ্চ থেকে উঠে পড়ে হাত-পা টানটান করতে-করতে বলল।
আমি ফোড়ন কাটলাম, “আর ভারতের কথাও তো আলাদা করে কিছু বললেন না। ভারতে কি ভূত ছিল না নাকি?”
ভদ্রলোক হেসে বললেন, “পরের প্রশ্নটার উত্তর আগে দিই। ভারতীয় পুরাণের কাহিনিতে দৈত্য, দানো, ভূত, প্রেত, ডাকিনী, যোগিনীদের উল্লেখ আছে, সে তো তোমরা জানোই। এমনকি অনেক ঐতিহাসিক বলেন, মৃতকে সম্পূর্ণ রূপে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা, যাতে কোনও ভাবেই মৃতের আত্মা তার দেহে ফিরে আসতে না পারে– ভারতীয়রা এই ভাবনা থেকেই মৃতদেহ সমাধিস্থ না করে বরং পুড়িয়ে ফেলার রীতি শুরু করেছিল। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ভূত নিয়ে কিছু কিছু বিশ্বাস একই রকম। যেমন ধরো, অশরীরী কোনও রকমে দেহ ধারণ করলেও তার ছায়া মাটিতে পড়ছে না। কিংবা সে হেঁটে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, অথচ তার পায়ের পাতা ঘুরে আছে পিছন দিকে। বা ধরো, পেতনির হাত-পা লম্বা হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনের গাছ থেকে ফুল, ফল পেড়ে আনছে– এমন নানান গল্প তোমরাও ছোটবেলায় শুনেছ নিশ্চয়ই।”
![]() |
| ভূত-পিশাচে বিশ্বাস ছিল উন্নত সভ্যতাদেরও |
.
অনেক দিন আগে পড়া অনেক ভূতের গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। ভদ্রলোকের মুখে নতুন নতুন গল্প শুনেও ভালই লেগেছে, কিন্তু মুখে সেটা স্বীকার না করে প্রতীক গোমড়া মুখে জানতে চাইল, “বুঝলাম, হাজার হাজার বছর আগে থেকেই লোকে ভূতে ভয় পাচ্ছে। এখন ভেবে দেখছি, সেটাই স্বাভাবিক। অনেক আগেকার মানুষের আয়ু ছিল কম। রোগ-অসুখে জর্জরিত ছিল জীবন। ওষুধবিষুধ এখনকার মতো জানত না। ইলেকট্রিসিটি ছিল না। রাত নামলে আগুনের শিখাই ছিল আলোর এক মাত্র উৎস। ফলে রোগে ভুগলে, দুর্যোগে পড়লে এই সব আজগুবি জিনিসে বিশ্বাস না করে তারা আর যাবে কোথায়? আপনি বলুন, ভূত আছে না নেই?”
তত ক্ষণে রাত অনেকটাই হয়েছে। বাড়ি ফিরতে আরও দেরি করলে প্রত্যেকেই বাড়িতে বকুনি খাব। আমরা তাই এক-এক করে বেঞ্চ ছেড়ে উঠে হাত-পা ঝাড়ছিলাম। ভদ্রলোকও উঠে পড়লেন। গালার মাফলারটা আরও এক বার ভাল করে জড়িয়ে নিয়ে বললেন, “ভূত সত্যি আছে কি না জানতে চাও? তার জন্য সাহস করে দু’পা হেঁটে আমার সঙ্গে আমার বাড়ি পর্যন্ত যেতে হবে। বলো, যাবে?”
![]() |
| ভূতের গল্পও পৃথিবীর অনেক জায়গায় একই রকম |
.
আমরা একে অন্যের মুখের দিকে তাকাচ্ছি, ও মা, ভদ্রলোক আমাদের উত্তরের অপেক্ষা না-করে উল্টো মুখে হাঁটা দিলেন! চোখে চোখে ইশারায় কথা বলে আমি, অর্ক আর স্বাগতা ঠিক করলাম, ভদ্রলোকের কথা শুনে যতই ভাল লাগুক, এত অল্প পরিচয়ে ওঁর বাড়ি আমরা যাব না। কিন্তু প্রতীক নাছোড়বান্দা। আমাদের চোখরাঙানিকে পাত্তা না দিয়ে সে ভদ্রলোকের পিছু নিল আর এক-দু’পা এগোতেই মুখে একটা বিকট বুঁ বুঁ আওয়াজ করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। অদ্ভুত শব্দটা শুনে আমরা প্রতীককে টপকে ভদ্রলোকের প্রস্থানোদ্যত চেহারাটার দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলাম কী হয়েছে।
পিছু নেওয়ার সাহস হয়নি। চার জনই সে দিন স্পষ্ট দেখেছিলাম, ইতিমধ্যে গলার মাফলার খুলে ফেলে ভদ্রলোক হেঁটে যাচ্ছেন আমাদের থেকে দূরে। তাঁর ধড় আর মুন্ডু যে যার জায়গায় থাকলেও গলার কাছটায় কিছু নেই। ধড়ের উপর মাথাটা যেন হাওয়ায় ভেসে আছে। ভয়ে শিউরে উঠে মাটির দিকে চোখ নামাতেই দেখতে পেয়েছিলাম, উনি সামনে এগিয়ে গেলেও ওঁর পায়ের পাতা দুটো আমাদের দিকেই ঘোরানো!
















No comments:
Post a Comment